logo
0
item(s)

বিষয় লিস্ট

শুভ দাশগুপ্ত এর সবটাই শুভ

সবটাই শুভ
এক নজরে

মোট পাতা: 599

বিষয়: সংকলিত গ্রন্থ

  • ৳ 35.00
  • + কার্ট-এ যোগ করুন

আমাদের শুভ

পার্থ ঘোষ ও গৌরী ঘোষ

 

প্রথমেই বলি, আমরা রাজনীতির লোক নই। রাজনীতির কিছু বুঝিও না। কিন্তু মাঝে মাঝে রাজনীতির আবর্তে এসে দাঁড়াতে হয়। হঠাৎ একদিন আমাদের অত্যন্ত কাছের একজন জানালো ছাত্র সংগঠন থেকে একটা দেশাত্মবোধক সিডি বের করা হবে। তাতে আমাকে আর গৌরীকে দরকার এবং সেখানে সমস্ত আবৃত্তিকারদের ডাকা হয়েছিল। গিয়ে দেখি বসে আছেন সর্বজনপ্রিয় নেতা সুভাষ চক্ৰবৰ্ত্তী, সুভাষদা। আমাদের দেখেই তারা বললেন, শুভ, এই তো পার্থদা, গৌরীদি এসে গেছেন, এবার শুরু করো। দেখি একটি ফর্সা লম্বা ছিপছিপে যুবক, মাথায় একঝাকরা চুল, খুব সপ্রতিভ চেহারা—নাম শুভ দাশগুপ্ত। সেই আমাদের সঙ্গে প্রথম আলাপ। ওর লেখা স্ক্রিপ্টটা আমাদের পড়ে শোনাল। আমরা অবাক হচ্ছিলাম ওর লেখাতে একদিকে তথ্যের সমাহার, অন্যদিকে ভাষা ব্যবহারের আশ্চর্য যাদু এবং শব্দচয়নের একটা নিজস্ব মুন্সিয়ানা। সেই সঙ্গে মুগ্ধ হলাম ওর জলদ গম্ভীর কণ্ঠস্বরে, অনবদ্য পড়ার ভঙ্গিতে। সেই পরিচয়ের প্রথম দিনটি ছিল বোধহয় আমাদেরও শুভলগ্ন। তারপর যখন পরিচয় গভীরতর হল, পরে ওর কবিতার সঙ্গে যখন ঘনিষ্ঠ পরিচয় হল, তখন বুঝলাম ও সত্যিকারের এক প্রতিভাবান কবি। ওর কবিতার উপাদান ও খুঁজে নেয় আজকের আর্থ-সামাজিক জীবন থেকে শুধু নয়, প্রকৃতি, ইতিহাস, রাজনীতি, দারিদ্র্য, ক্ষুধা এবং সমস্যায় জর্জরিত শহুরে জীবনের নানা উপাদান থেকে। এবং সেখান থেকেই ঠিকরে পড়ে ওর আত্মবোধের প্রতি দৃষ্টি এবং পচে যাওয়া সমাজের প্রতি ঘৃণা, বিদ্বেষ। তাই পরম মমতায় ফুটিয়ে তোলে বিধবা মায়ের প্রিয় সাবানদানির প্রতি গভীর সহানুভূতি। অথচ কবিতার ছত্ৰে ছত্রে ফুটে ওঠে ব্যঙ্গ, বিদ্বেষ এবং সমাজ দর্পণে বিভিন্ন দিক ও দেখে নেয় অত্যন্ত নিখুঁতভাবে। তাই ওর কবিতা খুব দ্রুত জনপ্রিয়তা লাভ করলো। বিভিন্ন আবৃত্তিকারেরা অপেক্ষা করে থাকলো কবে তাদের ‘শুভদা’র নতুন কবিতা হাতে পাবে। পাঠক, দর্শক, শ্রোতাও উন্মুখ হয়ে থাকতো ওর নতুন নতুন রচনার জোয়ারের জন্য। ওর কবিতা পড়বার ভঙ্গি এমনই ঋজু এবং সহজ প্রকাশভঙ্গি, যার জন্যে বিভিন্ন মঞ্চ থেকে আবৃত্তিকার হিসেবে ওর ডাক পড়তো। এখনও পড়ে।

তবে স্বরচিত কবিতা ছাড়া ওর কণ্ঠে অন্য কারোর রচনা পাঠ শুনিনি। আমরাও ওর কবিতার কিছু সিডি করেছি। তা ছাড়া বিভিন্ন সিডিতে অন্যদের সঙ্গেও ওর কবিতা পাঠ করেছি। ওর একটি লেখা ‘পলাশপুরের জীবন’কে নিয়ে দীর্ঘ কবিতা গৌরী, আমি ও শুভ তিনজনেই আবৃত্তি করেছি। সেই সময় ওর আরেকটা গুণের পরিচয় পেলাম। কবিতা আবৃত্তির মধ্যে মিউজিকের প্রয়োজন আছে বলে আমি আজও মনে করি না। কিন্তু ওর এই কবিতায় সঙ্গীতের ব্যবহার এতো অনিবার্য ছিলো, সেখানে মিউজিক ছাড়া এ আবৃত্তি করাই যেতো না। এ যেন আমাদের আরেকবার মুগ্ধ হবার পালা। ওর কবিতাগুলিকে ও নিজে কেন যে “না-কবিতা” বলে আমি আজও বুঝি না। যে কবিতার দর্পণে আমরা নিজেকে দেখতে পাই, সমাজকে দেখতে পাই, সন্ত্রাসবাদের প্রতি ঘৃণাকে খুঁজে পাই, সমাজের বিভিন্ন দিকের ব্যাধি এবং সমস্যার কথা খুঁজে পাই, যা কিনা রাজনীতির উচ্চকিত শ্লোগান নয়। তাতে ওর কবিতাকে “না-কবিতা” বলার কোন কারণ খুঁজে পাই না। শরৎচন্দ্র লিখেছেন—“আপন জীবনলব্ধ অভিজ্ঞতার বর্তিকায় বৃহত্তর জীবনে আলোক সম্পাতের পরিধির ওপর নির্ভর করে রসোত্তীর্ণ সাহিত্য সৃষ্টি।”—এই সত্যকে মেনে শুভ’র সাহিত্যসেবা সার্থক হয়েছে। আর আবৃত্তিকার হিসেবে ও অনেকেরই ঈর্ষার মানুষ। আমরা দুজনেই ওকে খুব ভালবাসি এবং সব সময়ই কামনা করি ওর উত্তর উত্তর শ্রীবৃদ্ধি ঘটুক, ওর জনপ্রিয়তায় আমাদের বুকটা ভরে ওঠে।

 

 


আমার কথা

 

আমি সহজ কথা সহজ করে সহজভাবে বলি

আমি সহজ পথে সহজভাবে সহজ মনে চলি

আমি বেড়াল বলি বেড়ালকে, আর সাপকে বলি সাপ

আমি বড় জুতোয় পা গলাই না—জানি নিজের মাপ

আসি স্পষ্ট বলতে কষ্ট পাই না ভ্রষ্টজনের হাটে

আমি ভয় পাই না—কবে রাজা আমার মাথা কাটে।

ছাগল এবং পাগল আমি তফাত করতে জানি—

(তাই) আমায় নিয়ে বাজার গরম—দারুণ কানাকানি।

আমি বড়লোকের সোফায় বসে চাষির ছবি দেখি না

আমি শখের ছেঁড়া পাঞ্জাবিতে ফ্রেঞ্চ পার্ফ্যুম মাখিনা

আমি বাস’এ বাদুড় ঝুলি, ট্রেনে চিঁড়ে চ্যাপ্টা হই

আমি ঘুষের পয়সায় সপরিবারে খাই না তেল-কই।

আমি যা-লিখি তা ভদ্রলোকে ‘কবিতা’ বলে না

আসলে—Intelectual ফড়েবাজি আমার চলে না

আমি ফুলকে বলি ফুল আর ভুলকে বলি ভুল

তাই আমার লেখা সূক্ষ্ম নয়—সে রুক্ষ এবং স্থুল।

আমি টালা এবং টালিগঞ্জের তফাত বুঝতে পারি

আমি ডাণ্ডা হাতে ঘুরি—ভাঙি হাটের মাঝে হাঁড়ি—

আমি মানুষ খুঁজে খুঁজে বেড়াই মুখোশ সম্মেলনে

জানি ঝুটো মালের বাজার তেজি তুখোড় বিজ্ঞাপনে।

আমি নেতা এবং অভিনেতার ফারাক ভালই বুঝি।

কবে উল্টে দেবো সাজানো ছক—সেই সুযোগটা খুঁজি।

আমি গাড়ি বাড়ি নারীর লোভে বিবেক বেচি না

আমি না-কবিতার ফেরিওলা, অ্যাওয়ার্ড খুঁজি না

আমি ভয় দেখাই না, সত্যি কথা বলি যে নির্ভয়ে

আমি জানি আমার সময় স্বদেশ নিত্য যাচ্ছে ক্ষয়ে

 

আমি নাক নরুণের তফাত বুঝি—জানি কার কী দাম

আমি অঙ্ক কষে ঠিক জেনেছি আমার পরিণাম—

শেষে আমার মুণ্ডু কাটা যাবে—সেই তাদেরই হাতে

যারা রাগে আগুন তেলে বেগুন হচ্ছে এই লেখাতে।

সে যা হয় হবে দেখা যাবে ভবিষ্যতের কথা

এখন বর্তমানে দাঁড়িয়ে জানাই বর্তমানের ব্যথা।

 

যাঁরা আমার কথা শোনেন এবং হাততালি দেন শেষে

তাঁরা একটু যদি ভাবেন আছেন কী আজব এ দেশে!

এবং এই স্বদেশেই বেঁচে থাকবে আপনার আমার ছেলে

তারা কেমন করে বাঁচবে কবির মুণ্ডু কাটা গেলে?

 

আমি তাদের কবি যাদের জীবন কেবল গদ্যে ভরা—

যারা খালি পেটেই শোনে ধনধান্য পুষ্পে ভরা

এদেশ নাকি সবার সেরা।

 

ভাবুন মশাই ভাবুন—

আর কতকাল কাব্য শুনে

আর কতকাল হিসেব গুনে

দিন কাটাবেন ভাবুন—

বিজ্ঞাপনে এদেশ মহান

সত্যি কী তা ভাবুন

ভাবুন মশাই, ভাবুন

ভাবুন—একটু ভাবুন।

 

 

 

 

 

 

 


মেঘ বললো

 

মেঘ বললো যাবি?

অনেক দূরের গেরুয়া নদী

অনেক দূরের একলা পাহাড়

অনেক দূরের গহন সে বন

গেলেই দেখতে পাবি।

যাবি?

জানলা দিয়ে মুখ ঝুঁকিয়ে

বললো সে মেঘ—যাবি?

আমার সঙ্গে যাবি?

দিন ফুরিয়ে রাত ঘনাবে

রাত্রি গিয়ে সকাল হবে

নীল আকাশে উড়বে পাখি

গেলেই দেখতে পাবি।

যাবি?

শ্রাবণ মাসের একলা দুপুর

মেঘ বললো যাবি।

আমার সঙ্গে যাবি?

 

কেমন করে যাবো রে মেঘ, কেমন করে যাবো?

নিয়ম বাঁধা জীবন আমার

নিয়ম ঘেরা এধার ওধার

কেমন করে নিয়ম ভেঙে এ-জীবন হারাবো?

কেমন করে যাব রে মেঘ কেমন করে যাবো?

 

মেঘ বললো—দূরের মাঠে বৃষ্টি হয়ে ঝরবো।

সবুজ পাতায় পাতায় ভালবাসা হয়ে ঝরবো।

শান্ত নদীর বুকে আনবো জলোচ্ছ্বাসের প্রেম

ইচ্ছে মতন বৃষ্টি হয়ে ভাঙব, ভেঙে পড়বো,

এই মেয়ে তুই যাবি?

আমার সঙ্গে যাবি?

 

যাব না মেঘ পারবো না রে যেতে—

আমার আছে কাজের বাঁধন—কাজেই থাকি মেতে।

কেবল যখন ঘুমিয়ে পড়ি—

তখন আমি যাই।—সীমার বাঁধন ডিঙিয়ে দৌড়ে

একছুটে পালাই।—তখন আমি যাই,

স্বপ্নে আমার সুনীল আকাশ

স্বপ্নে আমার দূরের পাহাড়

সব কিছুকে পাই

জাগরণের এই যে

আমি—ক্রীতদাসের মতন

জাগরণের এই যে আমি

এবং আমার জীবন

কাজ অকাজের সুতোয় বোনা

মুখোশ ঘেরা জীবন।

 

তবু রে মেঘ যাবো

একদিন ঠিক তোরই সঙ্গে

শ্রাবণ হাওয়ায় নতুন রঙ্গে

যাবো রে মেঘ যাবো।

সেদিন আমিই শিমুল পলাশ—

ভিজবে বলে যাবো।

পাগল হাওয়ায় উতল ধারায়

আমায় খুঁজে পাবো।

যাবো রে মেঘ যাবো।

যাবো রে মেঘ যাবো। 

সংশ্লিষ্ট বই

পাঠকের মতামত
  • Rating Star

    “বাস্তব বাদী লেখকের চোখ খুলে দেয়া কবিতা ” - rashed

রিভিউ লিখুন
রিভিউ অথবা রেটিং করার জন্য লগইন করুন!