logo
0
item(s)

বিষয় লিস্ট

আহমদ রফিক এর জাতিসত্তার আত্মঅন্বেষা

জাতিসত্তার আত্মঅন্বেষা
এক নজরে

মোট পাতা: 294

বিষয়: আত্মজীবনী

  • ৳ 50.00
  • + কার্ট-এ যোগ করুন

পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশ

 

সবাই জানি সম্প্রদায়গত বিদ্বেষবিরূপতায় ভর দিয়ে রক্তেধোঁয়ায় কালো এক অস্বাভাবিক, বিষাক্ত রাজনৈতিক পরিবেশে ভারতীয় উপমহাদেশের রাষ্ট্রিক বিভাজনে ভারত ও পাকিস্তান ডোমিনিয়নের জন্ম। দেশবিভাগের বহু-আলোচিত পটভূমিতে একটি কথা তখন বারবার উচ্চারিত হয়েছে যে পাকিস্তান ভৌগোলিক, জাতিসাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক এবং অনুরূপ একাধিক বিচারে একটি অস্বাভাবিক রাষ্ট্র। ধর্ম এর মধ্যে একমাত্র ঐক্যসূত্র। দ্বিজাতিতত্ত্বের প্রবক্তা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর ঘোষণাও ঐ ঐক্যসূত্রের উপর জোর দিয়ে উচ্চারিত হয়েছে : মুসলমান হিন্দুদের থেকে আলাদা এক জাতি। সে জাতির জন্য চাই ভারতের একাংশ নিয়ে স্বতন্ত্রভুবন ‘পাকিস্তান’। পরে বহু মুখে উচ্চারিত কথা : ‘পাকিস্তান টিকে থাকার জন্যই জন্ম নিয়েছে।’

 

পাকিস্তান রাষ্ট্রের দুর্বলতা

পশ্চিমা বুদ্ধিজীবীদের কেউ কেউ পঞ্চাশের দশক থেকেই পাকিস্তান রাষ্ট্রের অস্বাভাবিকতা নিয়ে আলোচনা করেছেন। জনৈক মার্কিন অধ্যাপক মন্তব্য করেছিলেন যে, ‘এই অদ্ভুত রাষ্ট্রের জন্মদাতা জিন্নাহ ও উঁচুস্তরের নেতাদের অনেকেরই পাকিস্তানের বাস্তবতা সম্বন্ধে যথেষ্ট সন্দেহ ছিল।’ আবার এমন মন্তব্যও কেউ কেউ করেছেন যে, পাকিস্তান একটি জাতি নিয়ে গঠিত হয়নি, আধুনিক বিচারে এক জাতিরাষ্ট্র বলা চলে না। জাতি গঠনের মূল শর্ত পাকিস্তান পূরণ করতে পারেনি। ভূখণ্ড, ভাষা, সংস্কৃতি ও জনতাত্ত্বিক ঐক্য এবং ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা ইত্যাদি কোনো দিক থেকে পাকিস্তানি জাতিসত্তা উদ্ভবের কোনো অবকাশ নেই। পাকিস্তান শুধু যে বহুজাতি নিয়ে গঠিত (ভারতও তাই) সেটাই একমাত্র বিচার্য বিষয় নয়। ভৌগোলিক দিক থেকে পাকিস্তানের দুই অংশের মধ্যে বারশ মাইলের ব্যবধান এবং নৃতাত্ত্বিক জনতাত্ত্বিক উৎস, ভাষা, সংস্কৃতি, ইতিহাস, সভ্যতা এবং জনচেতনার বৈশিষ্ট্য ইত্যাদি বহু দিক থেকে পাকিস্তানের পূর্ব ও পশ্চিম অংশের মধ্যে রয়েছে তাৎপর্যপূর্ণ বৈষম্য, মিলের চেয়ে অমিলই সিংহভাগ। তবু এ অস্বাভাবিক রাষ্ট্রটি গঠিত হয়েছিল উপমহাদেশের দুই প্রধান ধর্মীয় সম্প্রদায় হিন্দু ও মুসলমানের অসম বিকাশ (যা বঙ্গদেশে ছিল বিশেষভাবে প্রকট) এবং অর্থনৈতিক দ্বন্দ্বের কারণে; সেইসঙ্গে বিদেশি শাসকশক্তির ইচ্ছায় ও স্বার্থে।

শেষোক্ত কারণটি পাকিস্তানের জন্ম, প্রতিষ্ঠা ও স্থিতির ক্ষেত্রে কম গুরুত্ব বহন করে না। উপনিবেশবাদী ব্রিটিশ স্বার্থই শুধু নয়, সাম্রাজ্যবাদী মার্কিন আধিপত্যবাদী স্বার্থ (দক্ষিণ এশিয়ায়) রক্ষার জন্যও পাকিস্তানের প্রয়োজন ছিল, ছিল এক শক্তিমান পাকিস্তান রাষ্ট্রের। তাই পাকিস্তানকে টিকিয়ে রাখতে তার রাষ্ট্রিক বাস্তবতা প্রমাণ করতে, বিশেষভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এই অস্বাভাবিক রাষ্ট্রকে অস্বাভাবিক মাত্রায় অর্থ, অস্ত্র ও আধুনিক প্রশিক্ষণ জুগিয়েছে। পাকিস্তান রাষ্ট্রকে সমরতন্ত্রী ও মৌলবাদী চরিত্র অর্জনে সাহায্য করেছে। গণতন্ত্রের ধারকবাহকদের আন্তর্জাতিক প্রভাব সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থরক্ষার তাগিদে বারবার পাকিস্তানে গণতন্ত্রের ন্যূনতম উপস্থিতিও নষ্ট করেছে। পাকিস্তানকে নিয়ে গঠিত আন্তর্জাতিক চুক্তি সংস্থাগুলো (যেমন সিয়াটো, সেন্টো, বাগদাদ প্যাক্ট), এককথায় পাক-মার্কিন সামরিক চুক্তি মার্কিন রাজনৈতিক স্বার্থের প্রমাণ তুলে ধরে।

পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পেছনে স্থানিক দুটো শক্তি প্রধান উপকরণ হিসেবে কাজ করেছিল। ভারতীয় মুসলমান সম্প্রদায়ের শ্রেণিবিশেষের অর্থনৈতিক-সামাজিক স্বার্থ; দুই, ধর্মীয় আবেগ। তৃতীয় শক্তি ছিল সাম্রাজ্যবাদী রাজনীতির স্বার্থ। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার অন্তর্নিহিত আবেগ এতটাই প্রবল হয়ে উঠেছিল যে, সেই টানে বাঙালি মুসলমানও ভেবেছে পাকিস্তান তাদের অস্তিত্বের অংশ এবং একটি স্থায়ী রাজনৈতিক সত্য। শুরুতে তাদের কথায়, কাজে, আচরণে এ সত্যই প্রতিফলিত হয়েছে। বাঙালি মুসলমানের এই চেতনার উপর পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী নির্ভর করেছে এবং সেজন্যই পশ্চিম পাকিস্তানের সমৃদ্ধির জন্য নির্বিবাদে একতরফা নীতি গ্রহণ তাদের পক্ষে সম্ভব হয়েছিল। দুই অংশের মধ্যে বৈষম্য তৈরি করতে তারা দ্বিধা করেনি। তবে এই স্বার্থ ও সমৃদ্ধি ছিল মূলত পাঞ্জাবের।

কিন্তু হিসাবের গরমিলটা যে কোনো কারণে হোক তাদের নজর এড়িয়ে গিয়েছিল। ধর্মীয় ঐক্যের উপর সবিশেষ গুরুত্ব আরোপের কারণে পূর্ব-পশ্চিমের ব্যবধান ও দ্বন্দ্বের দিকটাতে তারা গুরুত্ব দেননি। একিলিসের গোঁড়ালির দুর্বল ও বিপজ্জনক বিন্দু তাদের চোখে পড়েনি। বুঝতে পারেননি যে, পূর্ববাংলা ও পশ্চিমপাকিস্তান কখনও একদেশ ছিল না। ভৌগোলিক ব্যবধানের চেয়েও বিপুল পার্থক্য ভাষা, সংস্কৃতি, পোশাকপরিচ্ছদ, খাদ্যাভ্যাস (যা নিয়ে পশ্চিমপাকিস্তানিদের পরিহাস ছিল খুবই) এবং জীবনাচরণের সর্বদিকে।

তারা আরও বুঝতে পারেনি যে, বাঙালি মুসলমান ধর্মরাষ্ট্র গঠনের জন্য অন্ধভাবে পাকিস্তান সমর্থন করেনি, করেছে তাদের অর্থনৈতিক সামাজিক স্বার্থের টানে; সেইসঙ্গে উন্নত প্রতিবেশীর কর্তৃত্বের ভয়ও একটি কারণ। অর্থনৈতিক প্রয়োজনের তাগিদ যে ধর্মচেতনার চেয়ে অনেক বেশি শক্তিমান এই সহজ, সত্য পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী বুঝে উঠতে পারেনি বা বুঝতে চায়নি। সত্যি বলতে কি উল্লিখিত দুর্বল বিন্দু যতটা ছিল ভাষাসংস্কৃতির পার্থক্যে তার চেয়ে অনেক গভীর ও তাৎপর্যপূর্ণ ছিল আর্থসামাজিক বৈষম্যে। এই বৈষম্যই পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশ-এ উত্তরণের ক্ষেত্রে মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করেছে। বৈষম্যই বিচ্ছিন্নতার মূল কারণ। যেমন অবিভক্ত ভারত তেমনি অবিভক্ত পাকিস্তান থেকে।

বাঙালি মুসলমানের আত্মপ্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষায় ঐতিহাসিক কারণে তার আত্মপরিচয়ের সমস্যাও জড়িত ছিল। সামাজিক-সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপট সেখানে প্রভাব রেখেছিল। ভূখণ্ড, ভাষা, ধর্ম ও জাতীয়তা এই চার উপাদান নিয়েই ছিল আত্মপরিচয়ের সমস্যা। এই সমস্যার অবসান ঘটানোর জন্য জেগে উঠেছিল আত্মঅন্বেষার তাগিদ, যা তার মধ্যে নানা টানাপোড়েনের জন্ম দেয়। ভাষা ও জাতীয়তাভিত্তিক স্বদেশ অর্জনের পর যুক্তিসঙ্গতভাবেই এসবের অবসান ঘটার কথা ছিল। কিন্তু ঘটেনি। 

সংশ্লিষ্ট বই

পাঠকের মতামত
রিভিউ লিখুন
রিভিউ অথবা রেটিং করার জন্য লগইন করুন!