logo
0
item(s)

বিষয় লিস্ট

সেলিনা হোসেন এর আমার স্কুল

আমার স্কুল
এক নজরে

মোট পাতা: 40

বিষয়: স্মৃতিকথা

  • ৳ 25.00
  • + কার্ট-এ যোগ করুন

স্কুলের সাথে বন্ধুত্ব

 

যে স্কুলে আমার প্রথম লেখাপড়া শুরু হয় তার নাম লতিফপুর প্রাইমারি স্কুল। কবে স্কুলে ভর্তি হয়েছিলাম সেই তারিখ বা সাল আমার মনে নেই। শুধু মনে আছে সময়টা ছিল পঞ্চাশের দশকের মাঝামাঝি। সে সময়ে আমার বাবা বগুড়ার সেরিকালচার নার্সারিতে চাকরি করতেন। নার্সারিতে বড় বড় তুঁত বাগান ছিল। আর ছিল পলু পোকার ঘর। এই সব পলু পোকা থেকে রেশমের গুটি তৈরি হতো। এই গুটিকে বলা হয় ককুন। ককুন থেকে রেশমের সুতো বের করে সিল্কের কাপড় তৈরি করা হতো। শুধু সিল্ক নয় গরদ, মটকা ইত্যাদি কাপড়ও তৈরি হতো। আমার বাবা এই অফিসের বড়বাবু ছিলেন। আমরা যেখানে থাকতাম সে গ্রামটির নাম ছিল গন্ডগ্রাম। কিন্তু আমাদের বাড়িটি ছিল নার্সারির ভেতরে। আর নার্সারিটি ছিল বগুড়ার বড় রাস্তার ধারে। এখন এই রাস্তা দিয়েই ঢাকা থেকে বগুড়ায় আসতে হয়।  তখন অবশ্য এই রাস্তা দিয়ে ঢাকা বগুড়ায় যাতায়াত করা যেত না। ট্রেনে করে ঢাকায় আসতে হতো। গন্ডগ্রাম নামটি আমার পছন্দের নাম ছিল না। কেমন বিদঘুটে লাগত। ছোটবেলায় মনে হতো এটা কোনো গাঁয়ের নাম হলো? গাঁয়ের নাম হবে অন্যরকম সুন্দর। ‘গন্ডমূর্খ’ শব্দটি জানতাম। বাড়িতে বা স্কুলে কাউকে বকা দেওয়ার সময় এই শব্দটি ব্যবহার করা হতো। সে কারণে গন্ডগ্রাম নিয়ে আমি খুব মন খারাপ করতাম। গ্রামের পাশেই একটি বিশাল বিল ছিল। বর্ষায় এই বিল পানিতে টইটম্বুর থাকত। চৈত-বোশেখ মাসে পানি শুকিয়ে গেলে কাদাপানিতে পোলো দিয়ে মাছ ধরতো সবাই। স্কুলের উঁচু ক্লাসে উঠে যখন অভিধান দেখতে শিখেছিলাম তখন আমি ‘গন্ডগ্রাম’ বলে কোনো শব্দ আছে কি না দেখার চেষ্টা করি। আমার ধারণা ছিল এটি একটি নাম মাত্র। এই শব্দ অভিধানে থাকবে না। কিন্তু অবাক হয়ে দেখলাম ‘গন্ডগ্রাম’ শব্দের একটি নয় দুটি অর্থ অভিধানে আছে। প্রথম অর্থটি হলো জনবহুল বড় গ্রাম। দ্বিতীয় অর্থ হলো ক্ষুদ্রগ্রাম; পল্লীগ্রাম অর্থেও ব্যবহৃত হয়। অভিধানে শব্দটি পেয়ে আমি বেশ আশ্বস্ত হয়েছিলাম। ভেবেছিলাম নিশ্চয় কোনো বড় পন্ডিত এই গ্রামটির নাম রেখেছিলেন। পন্ডিতের কথা ভাবতেই আমি আহ্লাদে আটখানা হয়ে গেলাম। কয়েকদিন বান্ধবীদের সঙ্গে অভিধানের গল্প করেছিলাম। একই সঙ্গে এই গ্রামে থাকার আনন্দও পেয়ে বসেছিল আমাকে। এখনও ওই গ্রামটির কথা ভেবে আমি বেশ আনন্দ পাই।

এই গ্রামটি বগুড়ার বিখ্যাত করতোয়া নদীর ধারে অবস্থিত। বিখ্যাত পুরাকীর্তি মহাস্থানগড়ের সভ্যতা কোনো এক সময়ে এই করতোয়া নদীর ধারে গড়ে উঠেছিল। মহাস্থানগড়ের ভগ্নাবশেষ এখনও আমাদের সে কথা মনে করিয়ে দেয়।

এই গন্ডগ্রাম থেকে পায়ে হেঁটে আমরা লতিফপুর প্রাইমারি স্কুলে যেতাম। আমরা বেশ কয়েকজন ছেলেমেয়ে দলবেঁধে, হৈচৈ করতে করতে স্কুলে পৌঁছে যেতাম। আমাদের প্রত্যেকের বাবা সেরিকালচার নার্সারিতে চাকরি করতেন। সবার বাড়িই ছিল কাছাকাছি।

এই দলে আমরা পিঠাপিঠি তিন ভাইবোনও ছিলাম। দলের সবার বয়স ছিল কাছাকাছি। তাই স্কুলে যাওয়ার পথটুকু ছিল আনন্দের। আমাদের জন্য সময়টা ছিল ভীষণ মজার।

আমাদের স্কুলে যাওয়ার পথ ছিল দুটো। একটি পুলিশ লাইনের ভেতর দিয়ে। অন্যটি পুলিশ লাইনের বাইরে দিয়ে। স্কুলের যাওয়ার পথে পুলিশ লাইনটি ছিল বাধার মতো। ভেতর দিয়ে গেলে আমরা অল্প সময়ে স্কুলে পৌঁছে যেতাম। বাইরের পথটি ছিল ঘুরপথ। আমাদের অনেকটা পথ হেঁটে স্কুলে পৌঁছাতে হতো। এই ঘুরপথে যেতে আমাদের মাঝে মাঝে ভীষণ রাগ হতো। কিন্তু কোনো উপায় ছিল না। পুলিশ লাইনটিকে তখন গালি দিতে দিতে যেতাম। মাঝে মাঝে আসা-যাওয়ার পথে পুলিশ লাইনের গেট বন্ধ করে রাখতে হতো।

আসলে পুলিশ লাইনের ভেতর দিয়ে যেতে আমরা বেশ মজা পেতাম। তখন এটাকে আমাদের আর বাধা বলে মনে হতো না। কখনও আমরা পুলিশের পিটি করা দেখতে দাঁড়িয়ে থাকতাম। কী সুন্দর একসঙ্গে হাত উঠছে, নামছে-। একসঙ্গে পা উঠছে, নামছে। আমাদেরকেও স্কুলে পিটি করতে হতো। কিন্তু খাকি হাফ-প্যান্ট পরা পুলিশের পিটির সৌন্দর্যই ছিল অন্যরকম। মাঝে মাঝে আমরা দূরে দাঁড়িয়ে ওদের বন্দুক ছোড়া প্র্যাকটিস করতে দেখতাম। দূরের চাঁদমারি টিলায় গুলির সিসা জমত। ওদের মধ্যে কেউ কেউ আমাদের নাম জিজ্ঞেস করত। কে কোন ক্লাসে পড়ি তা জানতে চাইত। এসব প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে দেরি হয়ে গেলে আমরা স্কুলে ঠিকমতো পৌঁছানোর জন্য দৌড়াতে শুরু করতাম। দৌড়াতে দৌড়াতে পৌঁছে যেতাম স্কুলে। ঠিক ঘণ্টা পড়ার আগে। বুকে হাঁফ ধরে যেত। জোরে জোরে নিঃশ্বাস ফেলতাম। তারপর অল্প সময়ে সব ঠিক হয়ে যেত। যেন ম্যাজিক। মনে হতো এক অদৃশ্য জাদুকর বুঝি আমাদের পিছে পিছে ঘোড়া নিয়ে ছুটছে। কখনও তুলে নিচ্ছে ঘোড়ার ওপরে, কখনও পঙ্খিরাজে। এই সব ভাবনার মাঝে বাতাসের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে হাওয়ার বেগে ছুটতাম। আমার ক্লান্তি ছিল না।

যেদিন পুলিশ লাইনে স্পোর্টস হতো আমরা দলবেঁধে দেখতে আসতাম। ওদের চাঁদমারি প্র্যাকটিসের দিন আমাদের জন্য ছিল সবচেয়ে মজার। সেদিন আমরা পুলিশ লাইনের বাইরে দিয়ে ঘুরপথে আসাটা বেশি পছন্দ করতাম। কারণ ঘুরপথেই পড়ত চাঁদমারি টিলাটা। আর আমরা টিলায় উঠে গুলি থেকে বেরিয়ে আসা সিসাগুলো খুঁজতাম মনের আনন্দে। এই সিসা হানিফের দোকানে দিলে হানিফ আমাদের লেবেনচুষ কিংবা মিষ্টি মুড়কি দিত। আমরা সেই সব খেতে খেতে বাড়ি ফিরতাম।

কখনও হানিফের দোকানের পেছনের ফলসা গাছটার নিচে বসে গুটি গুটি ফলসা কুড়াতাম। পেকে টসটসে হয়ে গেলে গাছ থেকে পড়ে যেত ফলগুলো। গাছের নিচে বিছিয়ে থাকত। আমরা আলতো হাতে তুলে নিতাম। বই-স্লেট রেখে দিতাম গাছের গোড়ায়। পিঁপড়ের সারি উঠে যেত গাছের কান্ড বেয়ে। আমরা ছড়া কাটতাম : ‘লাল পিঁপড়ে করমচা/গাছের ডগায় উঠে যা। দুটো ফল ঝরিয়ে দিবি/গুড়-মিষ্টি খেয়ে নিবি।’ ফল কুড়ানো শেষ হলে আমরা এই ছড়া কাটতে কাটতে গাছের চারদিকে ঘুরে বেড়াতাম। ফলসা গাছের শুকনো পাতা পায়ের নিচে মচমচ করত। আর কখনও ঘাসের ভেতরে ডুবে যেত পা। এভাবে স্কুল থেকে ফেরার আনন্দ আমাদের কাছে একেবারে অন্যরকম হয়ে যেত। আমার মনে হতো স্কুলে যাওয়া হয়েছিল বলেই এত মজা পাওয়া হয়েছিল। একই সঙ্গে এসব কিছুর জন্য সবার সঙ্গে প্রতিযোগিতা করাও ছিল ভীষণ চ্যালেঞ্জিং।

সেই বয়সেই মনে হয়েছিল স্কুল মানে শুধু পড়াশোনা নয়, চারপাশের জগৎকে চিনে নেওয়ারও চেষ্টা করা। চারপাশে কত কিছু ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে সেসব দু’চোখ ভরে দেখা। কখনও গাছ বলত আমাকে দেখো, কখনও নদী, কখনও ধানক্ষেত বা বিল। ছোট্ট পাখি, বুনোফুল বুঝি আমাদের সঙ্গী ছিল। ভীষণ ছোট ঘাসফুল ছিঁড়ে নাকে লাগাতাম। বন্ধুদের বলতাম, দেখ কি সুন্দর নাকফুল পেয়েছি।

দেখি, দেখি, বলে ওরা ছুটে আসত। কাছে এসে বলত, ইস কি সুন্দর ফুল! কোথা থেকে পেলি? আমাদেরকেও দে।

আমি বলি, উঁহু, এই ফুল শুধুই আমার। আর কাউকে দেয়া যাবে না। তোরা অন্যটা খুঁজে নে।

তোর মতো পারব না, তোর যা চোখ।

আমি দেব না।

অন্যরা তখন অন্য ফুল খুঁজতে ছুটত।

আর আমি বটের ডালে বসে থাকা ঘুঘুটার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকতাম। ওটার খয়েরি পালকের ওপর সাদা ফোঁটা দেখে মুগ্ধ হয়ে যেতাম। আর ঘু-ঘু ডাক শুনতে শুনতে আনমনা হয়ে উঠতাম। ভাবতাম কত কিছু যেন পেছনে ফেলে চলে যাচ্ছি। আমি আর এই সব হারানো মানিক ফিরে পাব না।

নদীর ধারে দাঁড়ালে খেয়াঘাটটা ছিল আমার আশ্চর্যের বিষয়। পারাপার দেখতে খুব ভালো লাগত। একদল যাচ্ছে, অন্যদল আসছে। আসা-যাওয়া - আসা-যাওয়া। আমার ভেতরে আসা-যাওয়া শব্দ গুমরাতে থাকত। আমি একদিন স্কুলের স্যারকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, স্যার নদী মানে কি? স্যার অবাক হয়ে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে বলেছিল, এমন প্রশ্ন কেন করলি? তুই নদী দেখিসনি? আমাদের বিখ্যাত করতোয়া নদী?

দেখেছি স্যার। অন্য ছেলেমেয়েরাও চেঁচিয়ে বলে, আমরাও দেখেছি স্যার।

তাহলে তো তোরা জেনেই গেছিস যে নদী দেখতে কেমন। নদী হলো একটি জলস্রোত। এই জলস্রোত পাহাড় কিংবা হ্রদ থেকে উৎপন্ন হয়। তারপর বিভিন্ন গ্রাম, শহর কিংবা পতিত জমির ওপর দিয়ে বয়ে যায়।

আমি তখন মনে মনে আউড়াতাম, নদী হলো একটি জল¯্রােত।

নদীর ধারে এসে বলতাম, জলস্রোত তোমার সঙ্গে আমাকে নাও। আমিও তোমার মতো নতুন নতুন জায়গা দেখতে চাই।

বই পড়ে যেসব কিছু শেখা যায় না স্কুলে থাকতেই আমি তা বুঝেছিলাম।

বিশাল কোন গাছের নিচে দাঁড়িয়ে বলতাম, তুমি কীভাবে এত বড় হয়েছ তা আমি দেখতে চাই।

স্কুলে যাওয়ার পথে প্রকৃতির সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি হওয়া ছিল আমার বড় শিক্ষা। মাঝে মাঝে এই সব নিয়ে স্যারদের প্রশ্ন করতাম। স্যাররা কখনও উত্তর দিতেন, কখনও দিতেন না। বলতেন, বড় বেশি কৌতূহল মেয়েটার।

চুপ হয়ে যেতাম স্যারের কথা শুনে। কিন্তু মনের ভেতরের প্রশ্নগুলোকে তাড়াতে পারতাম না। কেবলই মনে হতো পাখি কীভাবে ওড়ে, মাছ কীভাবে সাঁতার কাটে, অন্ধকারে পোকা ডাকে কেন-। এই সব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পেতাম না।

স্কুল থেকে ফেরার সময় মাঝে মাঝে বই-খাতা গাছের নিচে রেখে পেয়ারা কিংবা জাম গাছে উঠে যেতাম। সবুজ পেয়ারার ভেতরটা দেখতাম লাল হয়ে আছে। কখনও জাম গাছে ডালে বসে কালোজাম ছেঁড়ার ফাঁকে বড় লাল পিঁপড়ে কামড়ে দিত শরীর। বিষাক্ত পিঁপড়ের কামড়ে ফুলে যেত হাত কিংবা পা। কিন্তু সেটা এমন কিছু মনে হতো না। পাকা জামে জিভ লাল করার প্রতিযোগিতা তখন সামনে। পিঁপড়ের কামড়ে কি এসে যায়! প্রতিযোগিতাটাকেও আমি শেখার অংশ বলে মনে করতাম। প্রতিযোগিতা করে জয়ী হওয়াটাকে আমি ভীষণ গুরুত্ব দিতাম। এই প্রতিযোগিতা আমার ওই বয়সে আর কিই-বা হতে পারত। তাই প্রতিযোগিতার সামান্য বিষয়ও আমার মনোযোগ পেত। বিদ্বেষ বা আক্রোশ নয়, চ্যালেঞ্জই ছিল প্রধান। তাই হুটোপুটি করে প্রতিযোগিতার শেষে বই-স্লেট বুকে জড়িয়ে অনায়াসে বাড়ি ফিরে আসতাম। এত কিছুর মাঝে আমাদের পড়াশোনায় অবহেলা ছিল না। মনের আয়নায় শিক্ষকদের মুখ ভেসে উঠলে সন্ধ্যায় ঠিকই হারিকেনের আলোয় পড়া শিখতাম। ভাবতাম, শিক্ষকের সামনে সব পড়া না পারলে সেটা হবে ভীষণ লজ্জার। কখনও ভয়ে নয়, না পারার লজ্জায় পড়া শিখতাম। চারপাশের জগতের হাতছানির সঙ্গে পড়াশোনা এক হয়ে যেত। এই চারপাশের জগৎ যখন এক হয়ে যেতো তখন স্কুলকে আঁকড়ে ধরতাম। মনে হতো স্কুল নামক এই জগৎটা আছে বলেই চারপাশের সব কিছুকে নতুন করে দেখতে শেখা হয়েছে।

স্কুল ছিল আমার জীবনে বন্ধুর মতো।


 

সংশ্লিষ্ট বই

পাঠকের মতামত
  • Rating Star

    “ ” - Arefin Rafee

রিভিউ লিখুন
রিভিউ অথবা রেটিং করার জন্য লগইন করুন!